কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্য নির্ধারণ হলো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কলমের এক খোঁচায়। যশোরে বিএনপির তিনটি আসনে হঠাৎ প্রার্থী বদলের সিদ্ধান্ত শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো জেলা রাজনীতির শক্তির সমীকরণ ও কেন্দ্র–তৃণমূল সম্পর্কের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।
বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) একদিনেই যশোরের ছয় আসনের মধ্যে তিনটিতে প্রার্থী পরিবর্তন করে বিএনপি। দুপুরে যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে পরিবর্তনের পর রাতে বদলে যায় যশোর-১ (শার্শা) ও যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনের প্রার্থী। রাজনৈতিক মহলে একে দেখছেন ‘শেষ মুহূর্তের কৌশলগত পুনর্বিন্যাস’ হিসেবে।
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়ে দেড় মাস ধরে মাঠ চষে বেড়িয়েছিলেন ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ। পোস্টার, সভা-সমাবেশ আর নেতাকর্মীদের ব্যস্ততায় মনে হচ্ছিল, টিকিট প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দৃশ্যপট বদলে যায়। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত মনোনয়ন পান উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সদস্য আবুল হোসেন আজাদ। এতে প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘ প্রচারণা আর কেন্দ্রীয় পরিচয়ও কি এখন আর মনোনয়নের গ্যারান্টি নয়?
শার্শা আসনেও চিত্র প্রায় একই। কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মফিকুল হাসান তৃপ্তি প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়ে ব্যাপক গণসংযোগ চালালেও শেষ পর্যন্ত টিকিট যায় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনের হাতে। শুরু থেকেই তৃপ্তির বিপক্ষে একাট্টা ছিলেন স্থানীয় নেতারা। পর্যবেক্ষকদের মতে, এখানে জয়ী হয়েছে তৃণমূল ঐক্য, হেরেছে কেন্দ্রীয় প্রভাব।
অন্যদিকে যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে প্রার্থী বদল আরও বড় রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। বিএনপির নিজস্ব প্রার্থী অ্যাডভোকেট শহীদ মোহাম্মদ ইকবালকে সরিয়ে জোটের শরিক জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের (একাংশ) নেতা মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাসকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এতে তৃণমূল বিএনপির মধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। নেতাকর্মীদের একাংশ বলছেন, ‘জোটের রাজনীতির বোঝা বইতে গিয়ে নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতেই ফাটল ধরছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যশোরে এই তিনটি সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়েছে বিএনপির নতুন কৌশল—একদিকে তৃণমূল নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ ঠেকানো, অন্যদিকে জোটের সমীকরণ ঠিক রাখতে কিছু আসনে ছাড় দেওয়া।
তবে এর ঝুঁকিও কম নয়। যারা মনোনয়ন হারিয়েছেন, তাদের সমর্থকরা ভোটের মাঠে কতটা সক্রিয় থাকবেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে, যশোরে বিএনপির মনোনয়ন নাটক দেখিয়ে দিল—রাজনীতিতে শুধু মাঠের পরিশ্রম নয়, শেষ সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় কলম। আর সেই কলমের এক খোঁচায় মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে মাসের পর মাসের হিসাব-নিকাশ।