
বাংলাদেশ যেন এক দীর্ঘ নিদ্রায় আচ্ছন্ন। রাজপথে জনমানুষের মুখে আজ ক্লান্তি, চোখে অনিশ্চয়তা। সরকার ও প্রশাসনের অকার্যকর নীতিমালা, লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, সীমাহীন দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার অভাবে নাগরিক জীবনে নেমে এসেছে গভীর অস্বস্তি। অথচ ক্ষমতার আসনে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে আত্মতুষ্টি, আত্মগরিমা ও আত্মসমর্পণের এক মিশ্র প্রতিচ্ছবি।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় সামলানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম দিনে দিনে বাড়ছে, অথচ আয় রয়ে গেছে স্থবির বরং বেকারত্ব আরও বাড়ছে। বেকারত্ব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তরুণ প্রজন্মের এক বিরাট অংশ কর্মসংস্থানের অভাবে দিশেহারা। শিক্ষিত তরুণেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ, অনেকে দেশ ছাড়ার চিন্তায় মগ্ন। এই প্রবণতা কোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মতোই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে প্রশাসনিক কাঠামোও। দুর্নীতি এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং পরিণত হয়ে উঠেছে এক ধরনের নিয়মে। সরকারি দপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব এতটাই গভীর যে, সৎ ও দক্ষ কর্মীরা আজ কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। দলীয় প্রভাব ও ব্যক্তিগত স্বার্থের দাপটে প্রশাসনের অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায্যতা ও পেশাদারিত্ব হারিয়ে গেছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে বহু সমালোচনা হয়েছে। অতীতের মতো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নির্যাতন, গুলিতে মৃত্যুর অভিযোগ থেমে নেই। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সরকারের সময়ে সারা দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসেবে ওই সংখ্যা ৬০। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশিও হতে পারে।
বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা কাস্টডিয়াল টর্চারের যে কালচার সেটা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী বা নিরাপত্তা বাহিনী বেরিয়ে আসছে এখন পর্যন্ত এইটা বলার সুযোগ নাই। অর্থাৎ বিগত সরকারের আমলে যে অবস্থাটা ছিল, তার থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ব্যতিক্রম বলার কোনো সুযোগ আমার কাছে নাই। সুতরাং, ব্যক্তির পরিবর্তন ঘটলেও সিস্টেমের কোনো পরিবর্তন আদৌ ঘটে নি। এগুলো একটা রাষ্ট্রও জনগণের জন্য আতঙ্কের কারণ।
গণতন্ত্রের যে মৌলিক চেতনা একসময় দেশের গর্ব ছিল, তা এখন অনেকটাই কাগুজে হয়ে পড়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ওপর নানা ধরনের চাপ, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা এসবই একটি উদ্বেগজনক সংকেত। সত্য বলার দায়ে প্রাণ দিতে হয় যখন, তখন তা কেবল একজন মানুষের মৃত্যু নয় একটি সমাজব্যবস্থার নৈতিক মৃত্যুও বটে। স্বাধীন সাংবাদিকতা যেখানে বিপন্ন, সেখানে গণতন্ত্র টিকতে পারে না। কাগজে কলমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাড়লেও বাস্তবে তা একপাক্ষিক বটে। নাগরিক সমাজের একাংশ ভয় পায় কথা বলতে, সমালোচনাকে দেখা হয় বিদ্বেষের দৃষ্টিতে। এই নীরবতা কোনো জাতির জন্য আশীর্বাদ নয়; এটি ধীরে ধীরে স্বাধীন চিন্তার ভিত্তিকে ক্ষয় করে দেয়। এর প্রত্যেকটি ব্যর্থতার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের ক্ষমতা দখলের রাজনীতি। ক্ষমতার লোভে অভুত্থান পরবর্তী এখন পর্যন্ত বিএনপির হাতে খুন হয়েছে ২১৭ জন আনঅফিসিয়ালি সেটা আরও যার সংখ্যাটা অজানা। রাষ্ট্র যখন ভঙ্গুর অবস্থায় নিমজ্জিত তারা তখন ক্ষমতার লোভে ঢুবে আছে, ব্যক্তি ও দলের স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে দেশকে নিয়ে কেউ-ই ভাবতে পারছে না। এগুলো রাজনৈতিক দৈন্যতা পরিচায়ক।
অপরদিকে, উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রচার যতই জোরালো হোক, বাস্তবতার সঙ্গে তার অমিল দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। পরিসংখ্যানের সৌন্দর্যে ঢেকে রাখা যায় না সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কষ্ট। একদিকে উজ্জ্বল স্লোগান, অন্যদিকে বাস্তব জীবনের অন্ধকার এই বৈপরীত্যই আজকের বাংলাদেশের নির্মম বাস্তবতা।
তবু, হতাশা নয় এখন প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও জাগরণ। আমাদের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, সংকটের মুহূর্তেই জাতি জেগে উঠেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধ থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রতিটি অধ্যায়েই জনগণের জাগরণই ছিল পরিবর্তনের সূচনা। আজও সেই আহ্বান নতুন করে ধ্বনিত হচ্ছে। উদাসীনতা, ভয় ও নির্লিপ্ততা ঝেড়ে ফেলতে হবে। নাগরিক দায়িত্ববোধে উজ্জীবিত হতে হবে সবাইকে।
সরকারের উচিত হবে এই ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষকে হালকাভাবে না নেওয়া। উন্নয়ন মানে কেবল অবকাঠামো নয়; তা মানুষের জীবনে স্থিতি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা এনে দেয় কিনা সেটিই বড় প্রশ্ন। রাজনৈতিক ক্ষমতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের আস্থা ও সম্মতিতে টিকে থাকে। তাই সরকারের প্রতি আহ্বান নয় আদেশই করছি বটে, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার সংস্কৃতি পুনর্গঠন করুন, স্বাধীন মতপ্রকাশে বাধা না দিয়ে বরং তা উৎসাহিত করুন। সমালোচনার ভয় নয়, সমাধানের উদ্যোগই হতে পারে নেতৃত্বের প্রকৃত শক্তি।
অন্যদিকে, নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব কম নয়। পরিবর্তন কখনো একপাক্ষিক হয় না; তা আসে সম্মিলিত চেতনা থেকে। অন্যায় দেখেও চুপ থাকা মানে অন্যায়ের অংশীদার হওয়া। তাই সত্য বলতে শিখুন, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ান। তরুণ প্রজন্মকে সাহস দিন প্রশ্ন তোলার, ভাবার ও পরিবর্তনের পথে হাঁটার।
দেশের ঘুম ভাঙাতে হবে আজই কারণ প্রতিটি বিলম্ব আমাদের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে এবং অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সময় এসেছে আত্মতুষ্টির নয়, আত্মজাগরণের। সময় এসেছে ভয় নয়, সাহসের। কারণ আগামীকাল হয়তো সময় থাকলেও সুযোগ থাকবে না।