দেশের অন্যতম সরকারী প্রচার মাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশ বেতার বিনোদন দেয়ার পরিবর্তে এখন নিজেই বিনোদনের খোরাক হয়ে গেছে- বর্তমান বাস্তবতা যেন তেমনটাই ইঙ্গিত করছে।
সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া যেকোন ঘটনা কিংবা অভিযোগকে আমলেই নিচ্ছে না কিংবা গুরুত্বই দিচ্ছে না সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি। সবকিছুতে কেমন যেন একটা উদাসীন ভাব লক্ষ্য করা যায় সরকারী এই প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঝে।
বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না বাংলাদেশ বেতারের সদর দপ্তরে কর্মরত ঊর্ধ্বতন মহলের বেশ কয়েকজন। বিগত ১৬ বছর ফ্যাসিবাদী সরকারের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে পদোন্নতি পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা যেন হতাশ হয়ে পড়েছেন তাদের নেত্রীর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার করনে। প্রতিনিয়ত হতাশা আর নেত্রীর শূন্যতা অনুভব করায় আওয়ামী ঘনিষ্ঠ বেতার সংশ্লিষ্ট কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আসলে সহজভাবে নিতে পারেন না হাতে গোনা কয়েকজন আওয়ামী ঘনিষ্ঠ অফিসার। উল্টো বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের শাসনামলের সুবিধাভোগীদের কিভাবে বেতারে পুনর্বাসন করা যায় সেই প্রচেষ্টা বাস্তবায়নে অত্যন্ত কৌশলে পদক্ষেপ গ্রহন করেন এইসব কালচারাল ফ্যাসিস্টরা।
বেশকিছু বিষয়ে একের পর এক অভিযোগের পরও সবকিছুকে দুধভাতের মতো উড়িয়ে দেন বিগত সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই আমলারা। হঠাত স্বৈরাচারী হাসিনার পতনকে কিছুতেই মেনে নিতে না পারায় দিশেহারা বেতারের
অনেক কর্মকর্তা প্রতিনিয়তই ভুগছেন চরম হতাশা এবং অনিশ্চিয়তায়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ বেতারের একজন নারী অনুষ্ঠান উপস্থাপিকার ইয়াবা সেবনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরও কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি বেতার কর্তৃপক্ষকে। উল্টো ঐ নারী এনাউন্সারের পক্ষ নিয়ে নানারকম যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করছেন বেতার কর্তৃপক্ষ। কেউ বলছেন ভিডিওটি আগের, কেউ বলছেন ফেক ভিডিও, কেউ আবার এই ভিডিওর বিষয়ে চুপ থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ মাদকসেবনকারী উক্ত নারী অনুষ্ঠান উপস্থাপিকার পক্ষ নিয়ে হুমকি ধামকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ বেতারের মতো একটি সরকারী প্রচার মাধ্যমে একজন মাদকাসক্ত নারী কিভাবে অনুষ্ঠান করছে এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।
জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বেশ কয়েকজন জুলাই যোদ্ধা বিষয়টিকে খুবই দুঃখজনক এবং বিব্রতকর বলেও মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, বাংলাদেশ বেতারের সদর দপ্তরে কর্মরত ঊর্ধ্বতন মহল কিছুতেই এই দায় এড়াতে পারেন না। তাদের সবুজ সংকেতের কারণেই বাংলাদেশ বেতারের মতো সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান এখন মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এর দায় বেতার কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন ফ্যাসিবাদী বিরোধী আন্দোলনের বীর যোদ্ধারা।
বেতারে ডিউটি কমিয়ে দেওয়া কিংবা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের
সুযোগ না পাওয়ার ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন শিল্পী এবং কলাকুশলী জানান, যেসব অ্যানাউন্সস্যারদের সাথে ঊর্ধ্বতন অফিসারদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সত্য ঘটনা নিয়ে যত অভিযোগই করা হোক না কেন সেটা আমলে নেয়া হয় না। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমল থেকেই এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তারা।
ডিউটিতে দেরি করে আসা, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত না থেকে আগেই চলে যাওয়া, নিজের ইচ্ছেমত ঘনঘন ডিউটির তারিখ পরিবর্তন করা, জুনিয়র অ্যানাউন্সারদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা, বেতারকে নিজের বাপের সম্পত্তি মনে করাসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে অনেক অ্যানাউন্সারের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগীদের অনেকেই সঠিক বিচার না পাওয়ায় ভয়ে ভয়ে বেতারে কাজ করছেন বলে জানা যায়।
কয়েকজন অনুষ্ঠান উপস্থাপক- উপস্থাপিকা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হাতেগোনা কয়েকজন অ্যানাউন্সার বেতারের সদর দপ্তরের সব সেকশন মিলিয়ে ২০টিরও বেশি প্যাকেজ প্রোগ্রাম করছে। অথচ আগ্রহী এবং যোগ্য অনুষ্ঠান উপস্থাপক- উপস্থাপিকাদের প্যাকেজ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। নানাভাবে নানা উছিলায় তাদেরকে বছরের পর বছর বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বেতারের মতো একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে হাতেগোনা কয়েকজনই অনুষ্ঠান করবে আর বাকিরা শুধু স্টেশন কল দিয়েই বছরের পর বছর তাদের এনাউন্সমেন্টের বয়স পার করবে- এই বিষয়টিকে খুবই দুঃখজনক এবং বিব্রতকর বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।