যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে একটি টাউন হল সভা চলাকালে ডেমোক্রেট ও মুসলিম কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমারের ওপর স্প্রে (তরল পদার্থ) হামলা হয়েছে। ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার রাতে উত্তর মিনিয়াপোলিসের একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত এই সভায় উপস্থিত এক ব্যক্তি সিরিঞ্জ ব্যবহার করে তীব্র গন্ধযুক্ত স্প্রে ছিটিয়ে দেন বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা।খবর আইবিএননিউজ।
ঘটনার সময় ইলহান ওমর তার বক্তব্যের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করার দাবি জানান এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সেক্রেটারি স্ক্রিস্টি নোয়েমকে পদত্যাগের আহ্বান জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, বক্তব্য শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই দর্শকসারিতে বসা এক ব্যক্তি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে থাকেন এবং সিরিঞ্জ থেকে একটি তরল পদার্থ স্প্রে করেন। উপস্থিত অনেকে জানান, ওই তরলের গন্ধ ছিল ঝাঁঝালো ও অ্যাসিডের মতো।
ঘটনার পর ইলহান ওমর নিজেই ওই ব্যক্তির দিকে এগিয়ে যান। তবে সঙ্গে সঙ্গেই নিরাপত্তারক্ষীরা অভিযুক্তকে ধরে মাটিতে ফেলে দেন। পুরো ঘটনার সময় সভাস্থলে উপস্থিত অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
মিনিয়াপোলিস সিটি কাউন্সিল সদস্য লাট্রিশা ভেটাওয়াসহ কয়েকজন ওমরকে অনুরোধ করেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে সভা সংক্ষিপ্ত করে চিকিৎসা পরীক্ষা করানোর জন্য। তবে ইলহান ওমর সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলেন,“আর দশ মিনিট দিন। দয়া করে ওদের এই শো জিততে দেবেন না।”
অভিযুক্তকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় সভাকক্ষে করতালি পড়ে। তখন ওমার বলেন, “এ ধরনের কুৎসিত মানুষরা বুঝতে পারে না, আমরা মিনেসোটা স্ট্রং। ছোটবেলা থেকেই আমি শিখেছি, হুমকির কাছে মাথা নত করতে নেই।”
মিনিয়াপোলিস পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে হেনেপিন কাউন্টি জেলে পাঠানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তৃতীয় ডিগ্রির হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযুক্তের নাম অ্যান্থনি জেমস কাজমারচাক (৫৫)।পুলিশের মুখপাত্র ট্রেভর ফোলকের মতে, ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থলে এসে নমুনা সংগ্রহ করেছে। জেল রেকর্ড অনুযায়ী, কাজমারচাকের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক ট্রাফিক অপরাধের মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ২০০৯ ও ২০১০ সালে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর দুটি দণ্ড রয়েছে।
সিএনএনের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কাজমারচাক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত রাজনৈতিক বিষয়বস্তু শেয়ার করতেন। ২০২১ সালে পুলিশের বাজেট কমানোর দাবিতে ইলহান ওমারের অবস্থানের বিরোধিতা করে তিনি একটি রাজনৈতিক কার্টুনও পোস্ট করেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ-এর একটি অনুষ্ঠানের ছবি প্রোফাইল হিসেবে ব্যবহার করেন।
ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য : এ ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন, ইলহান ওমর নাকি নিজেই এই ঘটনাটি সাজিয়েছেন। এবিসি নিউজকে তিনি বলেন, “আমি ওকে নিয়ে ভাবি না। সে একটা প্রতারক। হয়তো নিজেই স্প্রে করিয়েছে।” তিনি আরও বলেন, ঘটনার কোনো ভিডিও তিনি দেখেননি এবং দেখার আগ্রহও নেই।
উল্লেখ্য, ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগেই আইওয়ায় এক সমাবেশে ট্রাম্প ইলহান ওমরকে লক্ষ্য করে তার জন্মভূমি নিয়ে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করেন, যা নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে এ ঘটনাকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে নিন্দা জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, “মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।”
এদিকে, ইউএস ক্যাপিটল পুলিশ এক বিবৃতিতে জানায়, ঘটনাটি “অগ্রহণযোগ্য” এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংস্থাটি জানায়, ২০২৪ সালে কংগ্রেস সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রায় ৯,৫০০ হুমকি ও উদ্বেগজনক ঘটনার তদন্ত করা হয়েছে, আর মোট সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার।
রিপাবলিকান পার্টির একাধিক কংগ্রেস সদস্যও এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। নিউইয়র্কের প্রতিনিধি মাইক ল’কলার বলেন, “রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না।”
ইলহান ওমরের প্রতিক্রিয়া : সভা শেষে সাংবাদিকদের ইলহান ওমার বলেন,“আমি যুদ্ধ টিকে গেছি। ভয় দেখিয়ে বা হুমকি দিয়ে আমাকে থামানো যাবে না।”
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, “আমি ভালো আছি। আমি বুলিদের জিততে দিই না। আমার অসাধারণ সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞ—মিনেসোটা স্ট্রং।”