
রক্তিম বিজয়ের স্মৃতি শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি অনুভবের, ধারণের এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে নেওয়ার বিষয়। সেই ভাবনা থেকেই মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে একটানা বিপ্লবী সাংস্কৃতিক আয়োজন করে বিপ্লবী শিল্পী সমাজ। দশ দিনব্যাপী এই আয়োজন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে শিল্প, সুর ও অভিনয়ের ভাষায় নতুন করে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেয়।

এই বিপুল কর্মযজ্ঞের নেতৃত্বে ছিলেন বিপ্লবী শিল্পীদের কালজয়ী আহবায়ক শোয়েব হোসেন। সংগঠনের সদস্য সচিব বিপ্লব চৌধুরীর প্রাণবন্ত উদ্যোগ, সাহসী সিদ্ধান্ত ও অক্লান্ত পরিশ্রম আয়োজনটিকে সফলতার উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। তাঁদের সম্মিলিত নেতৃত্বে এই আয়োজন হয়ে ওঠে শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয় বরং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি চলমান সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

গান, কবিতা, আবৃত্তি, অভিনয় ও ছন্দ-নৃত্যের সমন্বয়ে পরিবেশিত এবারের শ্লোগান ছিল “দূর্গম গিরি কান্তার মরু”। এতে ফুটে ওঠে স্বাধীনতা অর্জনের আনন্দ, স্বজন হারানোর বেদনা, যুদ্ধকালীন উত্তেজনা, সংগ্রামের সাহসিকতা এবং দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা। প্রতিটি পরিবেশনা দর্শকদের আবেগে নাড়া দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অনুভব করার এক গভীর অভিজ্ঞতায় নিয়ে যায়।
আয়োজকদের সূত্রে জানা যায়, এই আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল গত নভেম্বর মাস থেকেই। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর অঞ্চলে বিভিন্ন বিপ্লবী শিল্পী ও সংগঠনের অংশগ্রহণে নিয়মিত মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ এই প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য ছিল—দেশ ও জাতির মনে দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমকে আরও শক্তভাবে জাগ্রত করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা অর্জনের গুরুত্ব ও মহত্বকে দরদী, বিরহী ও বিপ্লবী সুরে পৌঁছে দেওয়া।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানগুলোর উল্লেখযোগ্য পর্ব আয়োজন করা হয় পরীবাগের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মাঠে। এসব আয়োজনে বিভিন্ন বয়সের দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চা আজও মানুষের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

আহবায়ক শোয়েব হোসেন শুধু একজন সংগঠক নন—তিনি একজন দক্ষ সংগীত শিক্ষক ও কণ্ঠশিল্পী। গত বছরের মতো এবারও তিনি নতুন শিল্পীদের বিপ্লবী সংগীতের প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়মিতভাবে নতুন প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব। ভবিষ্যতে বিপ্লবী শিল্পী সমাজের মাধ্যমে দেশবাসীকে আরও নতুন ও ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক উপহার দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
সাংবাদিকদের একান্ত সাক্ষাৎকারে শোয়েব হোসেন বলেন,
“মুক্তিযুদ্ধ আমাদের আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি। আমরা চাই নতুন প্রজন্ম ইতিহাস শুধু জানবে না, শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে তা অনুভব করবে। এই আয়োজন সেই দায়বদ্ধতা থেকেই।”
সংগঠনের সদস্য সচিব বিপ্লব চৌধুরী বলেন,

“এই আয়োজন সফল করতে শিল্পীদের সম্মিলিত শ্রম ও ঐক্যই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও আমরা বিজয় মাসের চেতনাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
বিপ্লবী শিল্পী সমাজের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন আরও বিস্তৃত আকারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠান শেষে সুধী সমাজের প্রতিনিধিরা ও দর্শকরা মত দেন, বর্তমান সময়ে যখন ইতিহাসবিমুখতা বাড়ছে, তখন এই ধরনের সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
উল্লেখ্য, এবারের আয়োজনের শ্লোগান ছিল—
“সংস্কৃতির শক্তিতে জাগ্রত হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা”
© ২০২০-২০২৫ তরঙ্গ টিভি, সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।