
চট্টগ্রামের ডিসি হিল বা ডিসির পাহাড় ‘নজরুল স্কয়ার’ নামে পরিচিত। এই পাহাড়ের শীর্ষ চূড়ায় রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সরকারি বাসভবন। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে এখানে আয়োজন করা হতো বাংলা নববর্ষ বরণে বাঙালির প্রাণের উৎসব। এর মধ্য দিয়ে ডিসি হিল ঐতিহাসিক গুরুত্ব ধারণ করেছে।
এখানকার মুক্তমঞ্চে আয়োজন করা হতো নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। কিন্তু ডিসি হিলসংলগ্ন আওয়ামী লীগের সাবেক এক মন্ত্রীর বাসভবন যেন এই আয়োজনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই মন্ত্রীর অনীহার কারণে ধীরে ধীরে ডিসি হিল বা নজরুল স্কয়ারকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী সব অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সাংস্কৃতিক কর্মীদের কার্যক্রম না থাকায় ডিসি হিল পুরোপুরি ডিসির কবজায় চলে যায়। সম্প্রতি ডিসি হিলের প্রবেশ গেট, সড়ক ও সীমানা প্রাচীরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু ভাঙাচোরা ও মলিন অবস্থায় রয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘চরণচিহ্ন’। এ নিয়ে চট্টগ্রামে সুশীল সমাজে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
শনিবার সরেজমিন নগরীর ডিসি হিলে গিয়ে দেখা যায়, নতুন করে তৈরি করা ডিসির গেট চকচক করছে। করা হয়েছে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা। ভেতরে যেতেই দেখা যায়, সড়কের পাশে নতুন করে রঙ দিয়ে রাঙিয়ে তোলা হয়েছে পুরো পথ। ভেতরের সবকটি গাছের গোড়ায়ও দেওয়া হয়েছে সাদা ও লাল রঙ। কিন্তু প্রবেশ গেটের উভয় পাশে বাংলাদেশ সংস্কৃতি ফোরামের সৌজন্যে তৈরি করা নজরুলের কবিতার সেই পঙ্তিগুলো হয়ে আছে বিবর্ণ।
ডিসি হিলের ভেতরে কবি নজরুলের ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’ কবিতার ১২ লাইন যে দেওয়ালে লেখা, সেখানের অবস্থাও নাজুক। ময়লা-আবর্জনায় ঢেকে আছে স্থানটি। শুধু তাই নয়, ভেঙে গেছে সিঁড়ির একপাশ। এই জায়গাটুকু দেখলে যে কারও মনে হবে-কবি নজরুলকে ইচ্ছাকৃতভাবে অযত্ন করা হচ্ছে। কিন্তু এর কারণ কী হতে পারে, এমন প্রশ্ন সেখানে বেড়াতে যাওয়া সচেতন নাগরিকদের মনেও। গত বছরের জুন থেকে পরবর্তী তিন মাস ধরে ডিসি হিলের অবকাঠামো সংস্কার হয়েছে।
জানা যায়, ১৯২৬ সালের জুলাইয়ে প্রথম চট্টগ্রামে এসেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কলকাতা থেকে এসে কবি তৎকালীন জেলা প্রশাসকের ডাকবাংলোতে ওঠেন। চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্র সংসদের নেতা কবির বন্ধু হবিবুল্লাহ বাহারের দাওয়াতে কলেজের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। হবিবুল্লাহ বাহার ও তার বোন শামসুননাহার মাহামুদ কবিকে তাদের বাসায় নিয়ে যান। নগরীর আন্দরকিল্লায় শাহী জামে মসজিদে এক সভায়ও যোগ দেন কবি নজরুল। অনুষ্ঠানে তাকে ‘কবি সম্রাট’ উপাধি দেওয়া হয়।
পাঠ করা হয় একটি ঘোষণাপত্র-‘এই সভা ঘোষণা করিতেছে যে, কবি নজরুল ইসলাম বাংলার মুসলমান সমাজের রত্নস্বরূপ’। এরপর নগরীর জেএমসেন স্কুল ও সীতাকুণ্ডে কবিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ওই সময় কবি মুসলিম হল, সীতাকুণ্ড পাহাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। চট্টগ্রামে বসে কবি লিখেছিলেন অনেক জনপ্রিয় কবিতা। যে কয়দিন ছিলেন তার কবিতায়, কথায়, বক্তৃতায় বিমুগ্ধ হন মানুষ। এভাবেই চট্টগ্রামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল জাতীয় কবির।
নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ডিসি হিল স্মরণীয় করে রাখতে ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করেছিল ‘চরণচিহ্ন’। ২০০৫ সালের ১০ এপ্রিল সেই চরণচিহ্ন উদ্বোধন করেন তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির। তবে সেই চরণচিহ্ন এখন বিবর্ণ হয়ে গেছে। অনেক স্থানে নেই স্মৃতি চিহ্নটুকুও।
সূত্র আরও জানায়, ২০১৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে ‘অপরিচ্ছন্নতার’ কারণ দেখিয়ে সে সময়কার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ডিসি হিলে বছরে তিনটি অনুষ্ঠান ছাড়া অন্য আয়োজন ‘না করার’ আহ্বান জানান। এই তিন অনুষ্ঠান হলো-পহেলা বৈশাখ এবং রবীন্দ্র ও নজরুলজয়ন্তী। সাবেক মন্ত্রীর এই আহ্বানের পর থেকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন নজরুল স্কয়ারে সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেওয়া বন্ধ রাখে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের একটি আবৃত্তি সংগঠন নজরুল স্কয়ারে অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি পায়। তবে এরপর আর উল্লেখযোগ্য কোনো অনুষ্ঠান হয়নি।
নজরুল গবেষক ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, নগরীর নন্দনকানন ডিসি হিলে বসে কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন কবিতা-‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি।’ তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি, নজরুল স্কয়ারে নানাভাবে শোভাবর্ধন হচ্ছে। এমনকি সেখানকার গাছগুলোও রঙ দিয়ে রাঙিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু নজরুলের সব স্মৃতি উপেক্ষিত। আমাদের আমলা বলেন, কবি আর সাহিত্যিক বলেন কিংবা রাষ্ট্র, সব সময় নজরুল তাদের কাছে অবহেলার শিকার হয়েছেন, হচ্ছেন। এটি নতুন করে নয় বরং এটি চলমান ধারাবাহিকতা। এই উপেক্ষার মূল হলো, নজরুলের প্রতি তাদের গভীরতা না থাকা, সেভাবে ধারণ না করা। অথচ নজরুলকে ধারণ করে আমরা বরং নিজেরাই সম্মানিত হতে পারতাম।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা যুগান্তরকে বলেন, সংস্কার কাজ এখনো শেষ হয়নি। নজরুল স্কয়ার নতুন করে রাঙিয়ে তোলা হবে। যেখানে অন্ধকার রয়েছে সেখানে আলোকসজ্জা করা হবে।
© ২০২০-২০২৫ তরঙ্গ টিভি, সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।