
বর্তমান বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ ও সম্ভাবনা-দুটিই তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের পর যেটাকে আমরা ‘পলিটিক্যাল স্পেস’ বা রাজনৈতিক পরিসর বলি, সেটা তো বেড়েছে। সেখানে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারছেন, বিভিন্নভাবে অংশগ্রহণ করছেন। কিন্তু গণতন্ত্র চর্চার তো শুধু সমাবেশ করা বা আলোচনা করাই নয়; গণতন্ত্র চর্চার কতগুলো দিক আছে। যেমন-এর কিছু প্রাতিষ্ঠানিক দিক থাকে, কিছু থাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আবার এর তৃতীয় আর একটা ডাইমেনশন বিবেচনায় নিতে হবে, সেটা হলো রাজনৈতিক অর্থনীতির দিকটা।
শেখ হাসিনা সরকার, একটা ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র, প্রতিষ্ঠানহীনতা, এক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করা; কার্যত এক দলের শাসন-সব মিলিয়ে যে পরিস্থিতিটা ছিল, সেখান থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় দিক তো সেটাই ছিল-এ স্পেসটা তৈরি করা।
তো সেই জায়গা থেকে এটি প্রসারিত হয়েছে, সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এ অর্থে যে-এখন এখান থেকে আমরা কোথায় যাব, সে সিদ্ধান্তটা আমাদের নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরির প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলি, প্রতিষ্ঠান তৈরি করার তাগিদটা সাধারণ মানুষের মধ্যেও আছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোও এখন এ ব্যাপারে কার্যত একমত যে, প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করতে হবে এবং সেগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে, যাতে করে কোনো অবস্থাতেই এগুলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সমর্থক না হয়ে পড়ে।
আর রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিক থেকে কিছু ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল ও জোট মাসের পর মাস প্রকাশ্যে আলোচনা করল, সহিষ্ণুতা দেখাল। তো সেটার খানিকটা পরিবর্তন আমরা লক্ষ করলাম। পরবর্তী সময়েও আমরা দেখলাম-শুধু জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বিষয় নয়, তার বাইরেও রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আলোচনার একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে এবং তারা করছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও সব দল একসঙ্গে হয়েছে, তারা আবার অন্য জোটের সঙ্গে কথা বলছে। এটা এক অর্থে বড় রকমের ইতিবাচক দিক। এটা যদি অব্যাহত রাখা যায়-আলাপ-আলোচনার জায়গাটা তৈরি করা এবং তা অব্যাহত রাখা যায়-সেটা খুবই ভালো হবে। কিন্তু সেটা অব্যাহত থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে আপনার ডেমোক্রেটিক স্পেসটা কতটা আছে তার ওপর। আরেকটা হচ্ছে, মৌলিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে মতপার্থক্য সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের প্রতি কতটা সহনশীল ও সহিষ্ণু থাকে তার ওপর।
তৃতীয়ত হলো রাজনৈতিক অর্থনীতি। রাজনৈতিক অর্থনীতিতে বড় রকমের পরিবর্তন ঘটেনি। কারণ এটা হঠাৎ করে ঘটে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির মতো রাজনৈতিক অর্থনীতিও রাতারাতি বদলে যায় না। সেই জায়গাটাকে আমি ‘সম্ভাবনার জায়গা’ বলছি। এ সম্ভাবনাটা আছে যদি রাজনৈতিক শক্তি-বিশেষত নতুন নতুন রাজনৈতিক শক্তির উদ্ভব ঘটে। তদুপরি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যদি এমন ব্যবস্থা করা যায় যে, গণতন্ত্র চর্চার অনুকূল পরিবেশ থাকবে, তাহলে রাজনৈতিক অর্থনীতি পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগটা তৈরি হবে। এখনো আমরা সম্ভাবনার জায়গায় আছি।
যে কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিটা ওই রাষ্ট্রের স্বার্থ অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থকে বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী বন্ধু নেই, স্থায়ী শত্রু নেই। রাষ্ট্রকে এটাই বিবেচনা করতে হবে। স্বল্পমেয়াদে নয় বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে দীর্ঘমেয়াদে। দীর্ঘমেয়াদে তার কী প্রতিক্রিয়া হবে, রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ বাস্তবায়ন এবং সুরক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদে তাকে ভাবতে হবে। এই যে ‘আগামীকাল আমরা ক্ষমতায় থাকলাম, এর মধ্যে এইভাবে সুযোগ-সুবিধাগুলো পাব’-সেইভাবে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করাটা হবে ভয়াবহ ক্ষতিকর।
বৈশ্বিকভাবেই আমরা এখন এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে আছি। কারণ কী? এক হচ্ছে যে, অর্থনৈতিকভাবে বিবেচনায় ক্ষমতার ভরকেন্দ্র এশিয়ায় ইতোমধ্যে উপস্থিত হয়েছে। প্রভাবের দিক থেকেও যদি বিবেচনা করি-চীনের যে উত্থানটা ঘটেছে, তা প্রমাণ করে যে, আগে এ জায়গায় এরকম কোনো শক্তি ছিল না। পুরো বিষয়টাই আগে আটলান্টিককেন্দ্রিক বা পশ্চিমকেন্দ্রিক ছিল, সেই জায়গাটা এখন ভেঙে পড়েছে।
এবং সেই ভেঙে পড়ার জায়গায় আমরা দেখতে পাচ্ছি-যেটাকে আমরা ‘রুল-বেজড গ্লোবাল পলিটিক্স’ বলতাম, অর্থাৎ কতগুলো নিয়মনীতি ও মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হওয়া-তাও পরিবর্তিত হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, বিশেষ করে গত এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে ট্রাম্প অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আন্ডারে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি-তা ভেনিজুয়েলার ঘটনাই বলুন কিংবা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেকে প্রত্যাহার-এগুলো কী প্রমাণ করে? এগুলো প্রমাণ করে যে, রুল-বেজড গ্লোবাল পলিটিক্স ক্রাম্বল (crumble) করতে শুরু করেছে, প্র্যাকটিক্যালি ভেঙে পড়েছে।
এখন এটা যখন পুনর্গঠিত হবে, এটা তো কোনো শূন্যতার (vacuum) মধ্যে থাকবে না। তাহলে কিছু নতুন শক্তির উত্থান ঘটবে। আবার পুরোনো শক্তি-যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপকে যদি আমরা পুরোনো শক্তি বলি, এগুলো তো হঠাৎ করে চলে যাবে না, তাদেরও প্রভাব থাকবে। এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন শক্তি দিয়ে এটা অ্যাসার্ট (assert) করার চেষ্টা করছে। অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে অকুণ্ঠ ছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল আদর্শিকভাবে বিজয় অর্জন করা অর্থাৎ ‘সফট পাওয়ার’-এর ব্যবহার করা। এখন ট্রাম্প অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সফট পাওয়ার নিয়ে মোটেই চিন্তিত নয়। তারা মনে করে যে ‘হার্ড পাওয়ার’ দিয়ে এটা বাধ্য করা যাবে। এই যে পরিবর্তনগুলো-এ পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশকে যুক্ত থাকতে হবে। বাংলাদেশকে তার জাতীয় স্বার্থই বিবেচনা করতে হবে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক। ক্ষমতায় কোন দল থাকল-সেটা যেন যারাই ক্ষমতায় থাকবেন তারা বিবেচনায় না আনেন। বিবেচনা করতে হবে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমি কোন নীতিটা অনুসরণ করব। আর সেটা যদি না করতে পারে, যদি বিবেচনা করে যে ‘আমার টিকে থাকার জন্য আমার এ সুবিধা হবে, আমার দলের প্রতি অন্য দেশের আনুকূল্য থাকবে’-এটা বিবেচনা করতে হবে; সেটা যুক্তরাষ্ট্রই বলুন, রাশিয়া বলুন, ভারত বলুন কিংবা চীন বলুন- ক্ষমতাসীনদের রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসাবে রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষা করে অগ্রসর হতে হবে। ফলে এই একটা পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে তাদের নির্ধারণ করতে হবে, আমি জাতীয় স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদে কার কাছ থেকে কতটুকু লাভবান হব।
আমরা যদি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ গণভোটের মধ্য দিয়ে জনগণের সম্মতি লাভ করি, পরবর্তীতে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন, ক্ষমতায় থাকবেন-তাদের উদ্যোগ নিতে হবে সেগুলো বাস্তবায়িত, সাংবিধানিকভাবে যুক্ত করার জন্য। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে আমাদের প্রস্তাব ছিল এবং এখন যেভাবে বাস্তবায়নের আদেশ দেওয়া হয়েছে যার ভিত্তিতে গণভোট, সেখানে বলা হচ্ছে যে-১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসাবে কাজ করে এ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ এগুলো বাস্তবায়ন করবে।
বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে এটা এক অর্থে ধাপে ধাপে হচ্ছে। কতগুলো বিষয় জুলাই জাতীয় সনদে একমত হওয়া গেছে, কিছু ভিন্নমত আছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো পরিবর্তিত হতে শুরু করবে। এটার প্রক্রিয়াটা অব্যাহত রাখতে হবে যে-প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো দাঁড় করানো, সেগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা, জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করা এবং অংশগ্রহণমূলক থাকা…। শুরুটা করতে হবে এগুলোর মধ্য দিয়ে-এগুলো সাংবিধানিক। আর দ্বিতীয় যেটা, এটা চর্চাটা করতে হবে। আপনি প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেন সেটাই যথেষ্ট নয়; চর্চার ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দলগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে। এবং এটাই হচ্ছে রাজনৈতিক দলের কাজ-জনগণকে এ ব্যাপারে আরও বেশি অবহিত করা এবং তাদের যুক্ত করা, তাদের জীবনে সেটার প্রভাবটাকে নিশ্চিত করা। এটা একটা প্রক্রিয়া। সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। ইতোমধ্যেই শুরুটা হয়েছে। এই যে বিভিন্ন কমিশনগুলো তৈরি করা, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা, তাদের ব্যাপারে অনেক বিষয়ে একমত হওয়া, তারপর জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর করা, তারপর এখন হচ্ছে একটা গণভোট-এটা কিন্তু একটা প্রক্রিয়া। এটাকে ধাপে ধাপেই এগোনো বলা যায়।
‘জুলাই জাতীয় সনদ’ যদি বাস্তবায়িত হয়, সেটাও আবার একটা ধাপ। তারপর সেগুলোকে নিশ্চিত করা, সুরক্ষা করা। গণতন্ত্র হচ্ছে এমন এক জিনিস যেটাকে প্রতিদিন রক্ষা করতে হয়। কারণ যারা গণতন্ত্রের বিরোধী শক্তি, তারা তো চেষ্টাই করবেন এটাকে ডিজম্যান্টল (dismantle) করা।
এটাকে অনুসরণ করা এবং এটাই একেবারে চূড়ান্ত তা নয়।
ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অমুক জিতবে না বলে ভোট দিচ্ছে না লোকে-এটার কিন্তু একটা সমাধান জুলাই জাতীয় সনদ দিয়েছে। সেটা হচ্ছে যে-উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতে থাকা। তার মানে হচ্ছে একটা রাজনৈতিক দল জিতবে না; অর্থাৎ আমি যে এলাকায় আছি সেখানে আমার প্রার্থী জিতবে না, তাতে আমার পছন্দের দল যে আকারের ছোট, জনসমর্থন কম, ফলে সে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হবে না, সে কারণে আমি ভোট দিচ্ছি না।
কিন্তু এখন যদি উচ্চকক্ষ তৈরি হয় সংখ্যানুপাতে-যেটা জাতীয় সনদে আছে, যেটা গণভোটে বলা হয়েছে-তাহলে কী হবে? ৫-৬ শতাংশ ভোট পেলেও তার প্রতিনিধি কিন্তু সংসদে থাকবে। ফলে নাগরিকরা কিন্তু এখন এটা বিবেচনা করতে পারবেন যে-ঠিক আছে সে জাতীয় সংসদে সদস্য হয়তো হবে না, কিন্তু আমি যদি আমার পছন্দের দলকে ভোট দিই উচ্চকক্ষে তার প্রতিনিধি পাঠানোর সুযোগ তৈরি হবে। তাহলে কোথাও না কোথাও আইনসভার কোনো না কোনো জায়গায় তার একটা প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এটা এ প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির ক্ষেত্রে একটু পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। আমরা আশা করছি এটা যখন চর্চা হতে থাকবে, তখন আমার পছন্দের রাজনৈতিক দল জিতবে অথবা জিতবে না-এ বিবেচনা থেকে মানুষ বেরিয়ে আসতে পারবেন।
নতুন বা তুলনামূলক মানুষের কাছে কম গ্রহনযোগ্য দলগুলো যদি তাদের দলের সমর্থন বা জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টার চাইতে ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতার কাছে থাকার বেশি চেষ্টা করে- তখন এ ধরনের প্রবণতার একটা নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়তে পারে। তা হচ্ছে একটা ভয়াবহ মেরুকরণকৃত (polarized) পলিটিক্স তৈরি হয়ে যেতে পারে। যেমন আপনার মধ্যে সব ছোট দল বিলীন হয়ে গেল, আবার আমি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী আমি কী করলাম-আমি আবার সব ছোট দল বা যাদের সমর্থন কম কিন্তু সমাজে এক ধরনের প্রভাব আছে তাদের আমার মধ্যে বিলীন করে ফেললাম। তাহলে কী হবে? খুব প্রত্যক্ষ মুখোমুখি একটা বাইনারি পলিটিক্স (binary politics) তৈরি হবে। এবং এ বাইনারি পলিটিক্স যে কোনো জায়গায় সবসময় এলে গণতন্ত্রের জন্য খুব ইতিবাচক হয় না।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ব্রিটেনে ক্ষমতার কাছাকাছি অর্থের বিবেচনায়-ব্রিটেনের ক্ষেত্রে লেবার পার্টি এবং কনজারভেটিভ, আর আমেরিকার ক্ষেত্রে যেটা আমরা দেখতে পাই তা হচ্ছে-হয় রিপাবলিকান না হয় ডেমোক্র্যাট-এই তো? কিন্তু অন্য দলগুলো কিন্তু আছে। তারা বিলীন হয়ে যায়নি। তারা হয়তো সমাজে উপস্থিত থাকছে, রাজনীতিতে কথাবার্তা বলছে। খুব যে বড় কিছু হয়েছে তা নয়। একটা ম্যাচিউর ডেমোক্রেসিতে (mature democracy) যদি একটা বাই-পার্টিজান (bi-partisan) ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড়ায় সেটা এক জিনিস; আর আপনি যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকছেন তখন যদি এরকম মেরুকরণ তৈরি করেন তাহলে তা বিপজ্জনক হয়।
অনেকেই অনেক দল থাকার ব্যাপারে আপত্তি করেন যে, এটা আসলে সমাজে এক ধরনের বিভক্তি তৈরি করে, অসংখ্য দল অসংখ্য মত। আমি মনে করি, গণতন্ত্রের চর্চার জন্য বিভিন্ন মতের উপস্থিত থাকা দরকার। আমি যেভাবে বলি কথাটা হচ্ছে-একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বহুমত বহুপথ থাকবে।
জাতীয় স্বার্থ, বাংলাদেশ, তার সার্বভৌমত্ব, তার জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি এবং বিভিন্নভাবে মানুষকে যুক্ত করা-এ সবকিছু মিলিয়ে আমাদের একটা অভিন্ন মোহনা আছে। ফলে বিভিন্ন মত-পথ থাকা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ার কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। আমি মনে করি, ভিন্নমত থাকবেই। আমি সবসময় এটার জন্য বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকাই এবং সেখানকার নদীগুলোকে দেখি। আমাদের কত নদী! কিছু নদী ছোট, কিছু নদী বড়, কিছু নদী কখনো অত্যন্ত উত্তাল হয়ে ওঠে, আবার কখনো বা শুকিয়ে যায়। তবে এ নদীগুলোকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব কিন্তু মানুষের। নদী কিন্তু নিজে নিজে টিকে থাকবে না। আমরা যদি নদীর ক্ষতি করি-যেমন ধরুন, পদ্মা নদীর অবস্থা; আমরা দেখলাম যে শুকিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে রাজশাহী এলাকায়। এর কারণ হলো ওপর থেকে পানি আসছে না। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে অসংখ্য ছোট নদী, বড় নদী (খাল-বিলের কথা বাদই দিলাম)-এগুলো শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে মিশেছে? এগুলো সব গিয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। ওই যে মোহনা, সেটা আবার আমাদের নতুন সুযোগও দিচ্ছে। মোহনা আছে বলেই তো আমরা সেখানে বন্দর তৈরি করছি, বন্দরের প্রয়োজনে একে আরও বড় করছি-এটা আমাদের একটা বড় সম্ভাবনা। যদি আমাদের এমন কোনো মোহনা না থাকত, তবে আমরা কখনোই বড় বন্দর বা তার ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবতেই পারতাম না।
তাই রাজনৈতিকভাবে আমি মনে করি, সমাজে বিভিন্ন মত-পথ থাকবে। কিন্তু একইসঙ্গে কিছু মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্যও থাকতে হবে। সর্বোপরি, আমাদের সেই মিলনের জায়গাটা তৈরি করতে হবে। আমরা যেন আলাদা আলাদা লক্ষ্য নিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ি। কারণ আমাদের লক্ষ্য যখন এক হবে, মোহনা যখন এক হবে, তখন আমরা অনেক বড় কিছু অর্জন (achieve) করতে পারব।
© ২০২০-২০২৫ তরঙ্গ টিভি, সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।